এস আলমের টাকাপাচারের চিহ্ন, নতুন করে ৮দেশের সন্ধান পাওয়া গেল এবং ১১৭ দেশে এই প্রথম নজিরবিহীন তল্লাশি
এস আলমের টাকাপাচারের চিহ্ন, নতুন করে ৮দেশের সন্ধান পাওয়া গেল এবং ১১৭ দেশে এই প্রথম নজিরবিহীন তল্লাশি।
ব্রিটেনে সাইফুল আলম মাসুদের মেজ ছেলে আশরাফুল আলম সাত মিলিয়নের ভিলা মালিক, দুবাইয়ের বিলাসী ভিলায় জামাতা ঢেলেছেন লাখ লাখ ডলার। এভাবে একে একে উন্মোচিত হচ্ছে বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন এক অর্থপাচারের গোপন সাম্রাজ্যের চিত্র।
বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন এক অর্থপাচারের গোপন সাম্রাজ্যের চিত্র ফাঁস হয়েছে বিশ্বজুড়ে চালানো একটি তদন্তে। চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদ ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে নয়টি দেশে ছড়িয়ে থাকা ৪৭০টিরও বেশি শেল কোম্পানির মাধ্যমে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা) পাচারের অভিযোগ উঠেছে। এই অঙ্ক বাংলাদেশের জিডিপির প্রায় চার শতাংশ, যা আধুনিক বিশ্বের অন্যতম বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির পর্যায়ে নিয়ে গেছে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর শুরু হওয়া অনুসন্ধানে উঠে এসেছে বিলাসবহুল ভিলা, পাঁচতারকা হোটেল, অফশোর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং গোপন নাগরিকত্ব কেনার মতো বিস্ময়কর সম্পদের বিস্তার। দীর্ঘদিন গোপন থাকার এখন যা বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম বেপরোয়া আর্থিক কেলেঙ্কারি হয়ে উঠছে।
৪৭০ শেল কোম্পানির আড়ালে ২ লাখ কোটি টাকা পাচার
অন্তত নয়টি বিদেশি আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার সরবরাহ করা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি সর্বশেষ অগ্রগতি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে—এস আলম গ্রুপ অন্তত ৪৭০টি ‘শেল কোম্পানি’র মাধ্যমে নয়টি দেশে পাচার করেছে প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা (২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)। বাংলাদেশের বর্তমান জিডিপির প্রায় ৪ শতাংশের সমান টাকা একক কোনো করপোরেট চক্রের হাত ধরে দেশের বাইরে পাচার, এমন কেলেঙ্কারি দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয়টি নেই।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, অর্থপাচারের এই ধরন ছিল জটিল ও বহুমুখী। দীর্ঘ পরিকল্পনা করে প্রতিটি দেশে গড়ে তোলা হয়েছে একাধিক শেল কোম্পানি। কাগজে-কলমে এগুলো আলাদা প্রতিষ্ঠান হলেও বাস্তবে একই নেটওয়ার্কের অধীনে পরিচালিত হয়েছে। আর্থিক উৎস গোপন রাখতে এসব কোম্পানি নিবন্ধনের সময় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কোনো মূলধন উল্লেখ করা হয়নি।।
১১৭ দেশে একযোগে অনুসন্ধান এই প্রথম
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) অনুসন্ধান কার্যক্রম সাধারণত কয়েকটি নির্দিষ্ট দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। এর মধ্যে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, হংকং, থাইল্যান্ড ও সুইজারল্যান্ড। কিন্তু এস আলমের বেলায় এসে তদন্তের এই সীমা ভেঙে গেছে।
এস আলমভিত্তিক কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণকারী বিশেষ পর্যালোচনা কমিটির সদস্য মোশাররফ হোসেনের নির্দেশনায় তদন্তকারীরা নজিরবিহীনভাবে ১১৭টি দেশে সম্পদের খোঁজে অনুসন্ধান চালায়। এই অনুসন্ধান ছিল শুধু অনুমানের ওপর নির্ভরশীল ছিল না। বরং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের সক্রিয় সহযোগিতায় সেখানে এস আলমের প্রকৃত বিনিয়োগ, সম্পদ ও ব্যাংক হিসাবের সন্ধান পাওয়া গেছে।
ফলাফলও ছিল চমকপ্রদ। সাইপ্রাস, অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডা, ইতালি, তুরস্ক, সিঙ্গাপুর, জার্সি, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং আইল অব ম্যানসহ বহু অঞ্চলে এস আলম সংশ্লিষ্টদের উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগের খোঁজ মিলেছে। এর মধ্যে সাতটি দেশ তদন্ত দলের কাছে প্রমাণসাপেক্ষ তথ্য সরবরাহ করেছে। বাকি দেশগুলো শুধুমাত্র নোট পাঠিয়েছে।
এই সাত দেশের সুনির্দিষ্ট নথির ভিত্তিতে তদন্তকারীরা জটিল আন্তঃসীমান্ত আইনি প্রক্রিয়া অতিক্রম করে আদালতের আদেশ পান, যার মাধ্যমে সিঙ্গাপুর, জার্সি, সাইপ্রাস ও ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জের ব্যাংক হিসাব ও বিনিয়োগ সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহের অনুমতি মিলেছে।
ট্যাক্স হেভেনে হাজার কোটির শেল কোম্পানি
আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের তদন্ত দল করের স্বর্গ হিসেবে পরিচিত ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জে সাইফুল আলম মাসুদ বা তার পরিবারের নামে নিবন্ধিত ১৯টি কোম্পানি চিহ্নিত করেছে। কোম্পানিগুলোর বেশিরভাগই ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে নিবন্ধিত। আওয়ামী লীগ আমলে ঠিক ওই সময়ে ব্যাংক খাতে এস আলম গ্রুপের বেপরোয়া হস্তক্ষেপ নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্ক শুরু হয়েছিল।
মাসুদ ও ফারজানা পারভীনের মালিকানাধীন একাধিক শেল কোম্পানির মধ্যে রয়েছে ৩৫০ হাজার মার্কিন ডলার (প্রায় ৩ কোটি ৮৫ লাখ টাকা) মূলধন দেখানো হ্যাজেল ইন্টারন্যাশনাল এবং পিকক প্রপার্টি হোল্ডিংস।
একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ হলো গ্রিনউইচ ইন্টারন্যাশনাল প্রাইভেট লিমিটেড, যা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট নিবন্ধিত হয়। অন্যদিকে প্রায় সবগুলো কোম্পানি নিবন্ধনের সময় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কোনো মূলধন উল্লেখ করা না হলেও হ্যাজেল ইন্টারন্যাশনাল প্রাইভেট লিমিটেডের বেলায় এর ব্যতিক্রম ঘটেছে। ২০১৯ সালের ১৯ মার্চ সাইফুল আলম মাসুদের নামে নিবন্ধিত ওই কোম্পানির ঘোষিত মূলধন দেখানো হয় ৩ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার (প্রায় ৪ কোটি টাকা)।
ট্যাক্স হ্যাভেন বা করের স্বর্গ হিসেবে পরিচিত স্বশাসিত ব্রিটিশ অঞ্চল জার্সিতে সাইফুল আলম মাসুদ ও তার স্ত্রী ফারজানা পারভীনকে স্থানীয় একটি ট্রাস্ট কোম্পানির মাধ্যমে ছয়টি জার্সি ট্রাস্টের যৌথ প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পাওয়া গেছে। এই জার্সি ট্রাস্টগুলো হচ্ছে— ম্যাপল, ক্যাপ্রি, সারে, শেন্টন, মারিনা, মিশন। এসবের মাধ্যমে তারা মালিক হয়েছেন অন্তত দুটি পাঁচ তারকা হোটেলের। ম্যাপল ট্রাস্ট রেনেসাঁ হোটেল ও ফোর পয়েন্টস শেরাটন (মালয়েশিয়া) নামের এই দুটি হোটেলের বাজারমূল্য প্রায় ২১ কোটি মার্কিন ডলার (প্রায় ২ হাজার ২০৩ কোটি টাকা)।
মেজ ছেলে সাত মিলিয়নের ভিলা মালিক
করের স্বর্গ হিসেবে পরিচিত আরেক অঞ্চল ‘আইল অফ ম্যান’-এ চেয়ারম্যানের সাইফুল আলম মাসুদের মেজ ছেলে ২৫ বছর বয়সী আশরাফুল আলমের মালিকানায় রয়েছে ৭ মিলিয়ন ডলারের (প্রায় ৭৫ কোটি টাকা) একটি ভিলা, যার ঠিকানা ব্রিটেনের কর্টন এলাকার লেদারহেড অক্সশটের ব্রুকউডের ১৫ নম্বর প্রিন্সেস ড্রাইভ। ২০২০ সালে কেনা এই সম্পত্তি আশরাফুলের মা ফারজানা পারভীনের উপহার হিসেবে নিবন্ধিত। এটি আগে সিঙ্গাপুরে বন্ধক ছিল।
রেসিডেন্সিয়াল) অনুমোদনও পায় পরিবারটি। বিদেশি নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশে স্থায়ী বসবাসের (পারমানেন্ট রেসিডেন্সি) সুযোগ পেতে এস আলম পরিবারের সদস্যরা জনপ্রতি বিনিয়োগ দেখান ৭৫ হাজার ডলার (প্রায় ৯০ লাখ টাকা) করে।
লেনদেন চলছেই ইটালির দুই একাউন্টে
ইটালিয়ান আর্থিক প্রতিষ্ঠান পোস্তে ইতালিয়ানে এসপিএ-তে সাইফুল আলম মাসুদ ও তার জামাতা বেলাল আহমেদের নামে দুটি অ্যাকাউন্ট রয়েছে, যাতে লেনদেন এখনও সক্রিয়। এছাড়া আরেক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এক্সট্রাবাঙ্কা এসপিএতে মাসুদের একটি অ্যাকাউন্ট রয়েছে, যা বর্তমানে বন্ধ।
জামাতার অ্যান্টিগুয়া নাগরিকত্বের টাকা আসে কানাডা থেকে
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, সাইফুল আলমের জামাতা বেলাল আহমেদ অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডার নাগরিকত্ব কিনেছেন দেশটির ‘সিটিজেনশিপ বাই ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম’-এর মাধ্যমে, যেখানে জাতীয় উন্নয়ন তহবিলে ১ লাখ মার্কিন ডলার (প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা) দিতে হয়।
লেনদেনের নথি বলছে, ওই অর্থ এসেছিল কানাডার অন্টারিও প্রদেশের মিসিসাগায় অবস্থিত টরন্টো-ডমিনিয়ন ব্যাংকে বেলাল আহমেদের অ্যাকাউন্ট থেকে পাঠানো ১ লাখ ২৭ হাজার ৪৫ ডলারের (প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা) অনলাইন ট্রান্সফারের মাধ্যমে। আবেদনপত্র প্রক্রিয়া তত্ত্বাবধানের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠান জেমস অ্যান্ড ম্যাগিনলি লিমিটেড ওই অর্থ গ্রহণ করে নাগরিকত্ব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে।
গায়ের জোরে ব্যাংক দখলে এস আলম
চট্টগ্রামভিত্তিক বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান এস আলমের উত্থানের পেছনে অন্যতম চালিকাশক্তি ছিল দেশের ব্যাংক খাতে আগ্রাসী দখল ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দেশের স্বনামধন্য বেসরকারি ব্যাংক হিসেবে পরিচিত ইসলামী ব্যাংককে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক নিয়ন্ত্রণে আনার পদক্ষেপ ধীরে ধীরে চলতে থাকে। ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি চূড়ান্তভাবে এস আলমের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
আওয়ামী লীগ সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশনায় সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের সরাসরি সহযোগিতায় ব্যাংকের চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালককে বাড়ি থেকে তুলে ঢাকার সেনানিবাসে গোয়েন্দা কার্যালয়ে নিয়ে যায়। সেখানে জোরপূর্বক পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানো হয় এবং একই দিন নতুন কর্মকর্তাদের বসানো হয়।
একই কৌশলে ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডও (এসআইবিএল) দখল করা হয়। দখলের আগে ১৯টি প্রক্সি কোম্পানির মাধ্যমে ব্যাংকের প্রায় ৫০ শতাংশ শেয়ার কিনে নেয় এস আলম, যা ছিল সরাসরি ১৯৯১ সালের ব্যাংক কোম্পানি আইনের লঙ্ঘন।
দুর্নীতির মামলা ও বর্তমান অবস্থা
বাংলাদেশ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) জানিয়েছে, সাইফুল আলম ও তার সহযোগীরা আত্মীয়দের নামে ভুয়া ঋণ ও বিনিয়োগ তৈরি করে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। আদালত ইতোমধ্যে তাদের ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করার নির্দেশ দিয়েছে।
২০২৪ সালের আগস্টে হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে দুদক সাইফুল আলম ও তার স্ত্রী ফারজানার বিরুদ্ধে ১ হাজার ৫৩৯ কোটি টাকার (প্রায় ১ হাজার ৮৭০ কোটি টাকা) অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলা করেছে। এছাড়া তাদের দুই ছেলে আহসানুল আলম মারুফ ও আশরাফুল আলমের বিরুদ্ধে ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা (প্রায় ২ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা) আত্মসাতের অভিযোগে মামলা হয়েছে।
আমার দেশ নিউজ
Post a Comment