প্রবাসী জীবন – রাসেল হোসাইনের কলমে এক দীর্ঘ যাত্রার গল্প

 

রাসেল হোসাইন 

প্রবাস… শব্দটি শুনলেই মনে হয়, যেন এক অপরিচিত পথে দীর্ঘ যাত্রা, যেখানে গন্তব্য আছে, কিন্তু পথে আছে হাজারো বাধা ও কষ্ট। অনেকের চোখে প্রবাস মানেই রঙিন স্বপ্ন, অনেক টাকা আয়ের সুযোগ আর উন্নত জীবনের হাতছানি। কিন্তু বাস্তবে প্রবাস জীবন অনেক বেশি জটিল, অনেক বেশি কঠিন। আমি, রাসেল হোসাইন, নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে প্রবাসের কথা বলতে চাই—যা হয়তো আপনার হৃদয় ছুঁয়ে যাবে।


দেশ ছাড়ার সেই মুহূর্ত

দেশ ছেড়ে যাওয়ার দিনটি আজও চোখে ভাসে। এক হাতে ছিল ব্যাগ, অন্য হাতে পরিবারকে বিদায়ের হাত নাড়ানো। মায়ের চোখে জল, বাবার মুখে নিঃশব্দ আশীর্বাদ, আর ভাইবোনদের চোখে অদ্ভুত শূন্যতা। বিমানের জানালা দিয়ে শেষবারের মতো দেশের আকাশ দেখে মনে হচ্ছিল—আমি কি ফিরতে পারবো আগের সেই আপন জীবনে?

নতুন দেশে প্রথম পা রাখার মুহূর্তটা ছিল ভিন্নরকম। চারপাশে অচেনা ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতি, অপরিচিত মুখ—সবকিছু যেন আমাকে জানিয়ে দিচ্ছিল, এই যাত্রা সহজ হবে না।


প্রবাসে প্রথম কিছু দিন – মানিয়ে নেওয়ার যুদ্ধ

প্রথম কয়েকদিন মনে হয়েছিল, আমি যেন এক নতুন পৃথিবীতে এসে পড়েছি। খাবারের স্বাদ, আবহাওয়া, এমনকি বাতাসের গন্ধও ভিন্ন। নিজের ভাষায় কারও সাথে কথা বলার সুযোগ কম, ফলে ভিতরে ভিতরে একাকীত্ব বাড়তে থাকে।


প্রবাসে প্রথম শিক্ষা হলো—এখানে বেঁচে থাকতে হলে নিয়ম মেনে চলতে হবে, আর মানিয়ে নিতে হবে প্রতিটি পরিস্থিতির সাথে। সময়মতো কাজে যাওয়া, আইন-কানুন বোঝা, সংস্কৃতিগত পার্থক্য মেনে চলা—সবই নতুন করে শিখতে হয়।


কাজের জীবন – ঘাম ঝরানো দিনের গল্প

অনেকে ভাবে প্রবাসে কাজ মানে আরাম, কিন্তু বাস্তবতা অনেক আলাদা। এখানে কাজ মানে হলো প্রচণ্ড গরমে বা শীতে, দিনে ১০–১২ ঘণ্টা পরিশ্রম করা। অনেক সময় খাবারের জন্যও আলাদা সময় মেলে না।


আমি নিজে দেখেছি, কেমন করে প্রবাসীরা দিনের পর দিন শুধু পরিবারের জন্য ঘাম ঝরায়। পাঠানো অর্থ দিয়ে দেশে হয়তো মায়ের চিকিৎসা চলে, সন্তানের পড়াশোনা হয়, ভাইয়ের বিয়ের খরচ মেটে, বা বাবা-মার ঋণ শোধ হয়। আমাদের কাছে প্রতিটি টাকা শুধু কাগজ নয়, এটি ত্যাগ আর ভালোবাসার প্রতীক।


একাকীত্ব – নীরব কষ্টের সঙ্গী

প্রবাস জীবনের সবচেয়ে বড় কষ্ট একাকীত্ব। দেশে যখন ঈদ, পূজা বা কোনো বিশেষ উৎসব হয়, তখন চারপাশে আনন্দ থাকলেও আমাদের ভেতরটা শূন্য হয়ে যায়। আমরা শুধু ফোনের স্ক্রিনে পরিবারের হাসি দেখি, কিন্তু পাশে বসে সেই আনন্দ ভাগ করতে পারি না।

রাতে যখন চারপাশে নীরবতা নেমে আসে, তখন মন চলে যায় সেই গ্রাম্য মাঠে, শৈশবের বন্ধুদের আড্ডায়, মায়ের হাতে রান্না করা খাবারের গন্ধে। প্রবাসে থাকলে বুঝতে পারা যায়—যা সহজে পাওয়া যায়নি, তার মূল্য কত বেশি।


প্রতিদিনের ছোট-বড় সংগ্রাম

প্রবাস মানেই শুধু শারীরিক কষ্ট নয়, মানসিক চাপও বিশাল। ভাষার অজানা শব্দ, কাজের চাপ, ভিন্ন দেশের নিয়মকানুন, আর বাসস্থানের সংকট—সবকিছুর সাথে মানিয়ে চলতে হয়। অনেক সময় ৪–৫ জন একই রুম ভাগ করে থাকে, যেখানে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বলতে কিছু থাকে না।

তবুও সবাই মনে মনে বলে—"এই কষ্ট একদিন শেষ হবে, স্বপ্ন একদিন পূরণ হবে।"


আশা – প্রবাসীর শক্তি

প্রবাস জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো আশা। প্রতিদিন সকালে কাজে যাওয়ার প্রেরণা এই আশাই দেয়। অনেকেই আশা করে—দেশে ফিরে নিজের বাড়ি হবে, সন্তান ভালো শিক্ষায় পড়বে, ব্যবসা হবে, আর একদিন পরিবারের সাথে শান্তির জীবন কাটানো যাবে।


আমারও স্বপ্ন আছে—একদিন দেশে ফিরে কিছু এমন কাজ করবো, যা শুধু আমার পরিবারের জন্য নয়, আশেপাশের মানুষেরও উপকারে আসবে। প্রবাসে থেকে আমি শিখেছি—টাকা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ভালো সম্পর্ক ও মানুষের ভালোবাসা আরও বেশি মূল্যবান।


গৌরব – ত্যাগের মধ্যেও সম্মান

হ্যাঁ, প্রবাস জীবন কষ্টে ভরা, কিন্তু এর মধ্যে রয়েছে এক ধরনের গর্ব। কারণ আমরা প্রবাসীরা শুধু নিজেদের জন্য নয়, দেশের জন্যও কাজ করি। আমাদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।


রাসেল হোসাইন হিসেবে আমি গর্বিত—আমি একজন প্রবাসী। এই জীবন আমাকে শিখিয়েছে ধৈর্য, শৃঙ্খলা, পরিশ্রম আর মানুষের আসল মূল্য।


শেষ কথা

প্রবাস জীবন অনেকটা সমুদ্রযাত্রার মতো—কখনো ঢেউ শান্ত, কখনো তীব্র ঝড়। কিন্তু লক্ষ্য যদি পরিষ্কার থাকে, ধৈর্য যদি অটুট থাকে, তবে গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব। প্রতিটি কষ্টের পেছনে লুকিয়ে থাকে স্বপ্ন পূরণের ইচ্ছা, আর প্রতিটি ত্যাগের পেছনে থাকে ভালোবাসার গল্প।


আজ আমি গর্ব করে বলতে পারি—প্রবাস আমার জীবনের শিক্ষক। এটি আমাকে শিখিয়েছে, জীবনে কষ্ট যত বড়ই হোক, আশা আর চেষ্টা থাকলে একদিন সব ঠিক হয়ে যায়।


রেখেছেন 

মোঃ রাসেল হোসাইন 

Post a Comment

Previous Post Next Post